জিয়াউলকে নিয়ে সাবেক সেনাপ্রধানের বিস্ফোরক জবানবন্দি

নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৮:২৪ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৯, ২০২৬

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে বিস্ফোরক জবানবন্দি দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূইঁয়া। তার জবানবন্দিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার একাধিক গুরুতর তথ্য উঠে এসেছে। একই সঙ্গে গত দেড় দশকের আওয়ামী শাসনামলে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সশস্ত্রবাহিনীতে স্বেচ্ছাচারিতা, অনুগতকরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্রও প্রকাশ পেয়েছে।

জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূইঁয়া জানান, র‍্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই জিয়াউল আহসান ক্রমেই অতিরিক্ত উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠেন। এই পদে দায়িত্ব পালনকালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি বলেন, “র‍্যাবের ডিজি হিসেবে বেনজীর আহমেদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে জিয়াউল আহসান এডিজি র‍্যাব হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট (এএসইউ) সূত্রে জানতে পারি যে কর্নেল জিয়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দিয়েছেন।”

সাবেক সেনাপ্রধান আরও জানান, জিয়াউল আহসান তার আবাসিক টাওয়ারে নিজস্ব গার্ড নিয়োগ দেন, বাসায় অস্ত্র রাখেন এবং পুরো ফ্ল্যাটজুড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেন। বিষয়টি সামরিক শৃঙ্খলা ও নিয়মের পরিপন্থী হওয়ায় তাকে গার্ড প্রত্যাহার, ক্যামেরা খুলে ফেলা এবং বাসায় অস্ত্র না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে এসব নির্দেশ উপেক্ষা করে তার আচরণ আরও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠে।

ইকবাল করিম ভূইঁয়া জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল তাকে জানান—জিয়াউল আহসানের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তার মনে হয়েছে, যেন তিনি এমন একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন যার মস্তিষ্ক পাথর বা ইটের টুকরো দিয়ে ভরা; যাকে বোঝানো প্রায় অসম্ভব। এক পর্যায়ে নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল তারেক আহমেদ সিদ্দিকী, এমএসপিএম এবং তার কোর্সমেট কর্নেল (বর্তমানে মেজর জেনারেল) মাহবুবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে জিয়াউল আহসান সেনাপ্রধানের নির্দেশকেও প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ইকবাল করিম ভূইঁয়া জিয়াউল আহসানকে রেললাইনের পশ্চিম পাশের ক্যান্টনমেন্টে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ (পিএনজি) বা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। যদিও তাকে পূর্ব পাশের আবাসনে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় লগ এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মিজানকে। তবে নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে আগাম না জানানোয় তাকেও বিরাগভাজন হতে হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়।

জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান আরও বলেন, ১৯৯৬-২০০১ সময়কালের রাজনৈতিক ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে দেশের একমাত্র ক্ষমতাসীন শক্তিতে পরিণত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। সে লক্ষ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং সংবিধান লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধানসহ একাধিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

তিনি অভিযোগ করেন, সেনাবাহিনীতে যেসব কর্মকর্তা মেধাবী ও স্বাধীনচেতা ছিলেন, তাদের ‘বিএনপি বা জামায়াতপন্থি’ আখ্যা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাদের জায়গায় অতীতের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আত্মীয়তার যোগসূত্র কিংবা প্রমাণিত রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে অনুগত কিন্তু অপেক্ষাকৃত অযোগ্য কর্মকর্তাদের বসানো হয়। ২০০৯ সাল থেকেই ক্লিন হার্ট ও জরুরি শাসনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একদল নিরেট অনুগত অফিসার শেখ হাসিনার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

ইকবাল করিম ভূইঁয়া বলেন, শেখ হাসিনা মেজর জেনারেল তারেক আহমেদ সিদ্দিকীকে নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের মাঝখানে ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠেন। পিএসও এএফডির মাধ্যমে সব গুরুত্বপূর্ণ পদোন্নতি ও সামরিক কেনাকাটার ফাইল তার অনুমোদনের জন্য পাঠানো বাধ্যতামূলক করা হয়। শত শত কোটি টাকার সামরিক কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এসব সিদ্ধান্তের লিখিত নথি সংরক্ষণ করা হয়নি।

এর ফলে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা দ্রুত বুঝে যান প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়। তারা নিজেদের চিফকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি নিরাপত্তা উপদেষ্টার কাছে তদবির শুরু করেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও সামরিক সুবিধা আদায়ের জন্য তারেক সিদ্দিকীর চারপাশে ভিড় জমাতে থাকেন। এতে সেনা সদর দপ্তরে তদবির ও চাপ বহুগুণে বেড়ে যায়।

জবানবন্দিতে বলা হয়, তারেক আহমেদ সিদ্দিকী ধীরে ধীরে ডিজিএফআই, এনএসআই, এএফডি, বিজিবি, আনসার, এনটিএমসি, ডিজিডিপি ও র‍্যাবের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে বাধার মুখে পড়েছেন, সেখানে পূর্বতন কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিয়ে নিজস্ব অনুগত অফিসার বসানো হয়েছে। তার নির্দেশনায় ডিজিএফআই, এনএসআই ও র‍্যাব গুম, খুন, অপহরণ, জমি দখল, ব্যবসা-বাণিজ্যে চাঁদাবাজি, নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে জবানবন্দিতে।